ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে হিংসার পথ অবলম্বন করে কোন স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এমনই এক দার্শনিক উপলব্ধিবোধ থেকে বুধবার পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের ত্রাস তিন শীর্ষ মাওবাদী নেতা নেত্রী। রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে শচীন, জবা মাহাতো এবং নয়নতারা সাহু নামে ওই তিন মাওবাদী নেতা-নেত্রী মূলত পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলমহল এলাকায় বিগত কুড়ি বছর ধরে সক্রিয় ছিলেন। ওই তিনজনের বিরুদ্ধে মোট আশিটি ফৌজদারি অপরাধ রয়েছে বলে জানান রাজ্য পুলিশের এডিজি পশ্চিমাঞ্চল আনন্দ কুমার। আত্মসমর্পণকারী ওই তিন মাওবাদী নেতা নেত্রী এদিন দুটি ইনশাস রাইফেল,একটি একে-৪৭ বন্দুক, এছাড়াও দশটি ম্যাগাজিন ও ১৪৪ রাউন্ড কার্তুজ জমা দিয়েছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই প্রতিটি বন্দুক ও গোলাবারুদ পুলিশের কাছ থেকেই তারা বিভিন্ন সময়ে ছিনতাই করেছিল বলে এক সাংবাদিক বৈঠকে জানান পশ্চিমাঞ্চলের এডিজি আনন্দ কুমার। উল্লেখ্য, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দেশ থেকে মাওবাদী ও নকশাল পন্থী আন্দোলনকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তরফে ঘোষিত ওই চ্যালেঞ্জ ইতিমধ্যেই ছত্রিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ এই চার রাজ্যের নকশালপন্ত্রী ও মাওবাদী আন্দোলন কারীদের কানে পৌঁছেছে। সম্প্রতিক অতীতে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে একের পর এক ধরা পড়েছে বেশ কয়েকজন শীর্ষ মাওবাদী ও নকশালপন্থী নেতা নেত্রী। পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকারীরা। বেশ কিছু জায়গায় পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মৃত্যুও হয়েছে কয়েকজন কট্টর পন্থী মাওবাদী নেতা নেত্রীর। পুলিশের এই ধারাবাহিক সাফল্য দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন মাওবাদীদের বেশ কয়েকটি স্কোয়াডের সদস্যরা। সম্ভবত সেই আতঙ্ক থেকেই তাঁরা সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন রাখেন। বুধবার বাঁকুড়া থানায় আত্মসমর্পণকারী রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে শচীন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, হিংসার রাজনীতি কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বর্তমানে রাজ্য সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো নির্মাণ এবং গ্রামীণ দরিদ্র মানুষদের একটি সম্মানজনক জীবন যাপনের পরিকাঠামো তৈরি করেছেন। এখন আর জঙ্গলমহলে আগের মত অনুন্নয়ন নেই। সব সমস্যার হয়তো সমাধান হয়নি, কিন্তু হিংসার পথে সেই সমস্যাগুলির সমাধানও কখনোই সম্ভব নয়, তাও তাঁরা জেনেছেন। সে কারণেই তাঁরা সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসার জন্য এদিন আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। প্রায় একই কথা বলেন জবা মাহাতো এবং নয়নতারা সাহু। তাঁরাও বলেন, বন্দুকের নলের মুখে কখনোই উন্নয়ন হতে পারে না। উন্নয়ন একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক উপায়ে শান্তির পথ ধরেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। দেরিতে হলেও তাঁদের মধ্যে এই উপলব্ধি বোধ জন্মেছে। তাই এদিন তাঁরা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পুলিশের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রগুলি জমা দিলেন। এই আত্মসমর্পণের বিষয়ে এডিজি পশ্চিমাঞ্চল আনন্দ কুমার বলেন, যে তিনজন এদিন আত্মসমর্পণ করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে মোট আশিটি অপরাধের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আত্মসমর্পণ করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা গুলি চলতেই থাকবে। তারা ইতিপূর্বে কোথায় কোথায় কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত করেছেন, তা জানতে তিন আত্মসমর্পণকারীকেই জিজ্ঞাসা বাদ করা হবে বলে জানান পুলিশের এই শীর্ষকর্তা। একই সঙ্গে তিনি জানান, কোন নিষিদ্ধ সংগঠন থেকে কেউ যদি আত্মসমর্পণ করতে চান, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য ভারতীয় সংবিধানে যে ধরণের পুনর্বাসনের প্যাকেজের ব্যবস্থা আছে, সেই অনুযায়ী এই তিনজনও যাতে সেই প্যাকেজের সুযোগ পান সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট স্ক্রীনিং কমিটির কাছে সুপারিশ জানাবে পুলিশ।
বাঁকুড়ায় আত্মসমর্পণ করলেন তিন মাওবাদী শীর্ষ নেতা নেত্রী!
বাঁকুড়ায় আত্মসমর্পণ করলেন তিন মাওবাদী শীর্ষ নেতা নেত্রী!
নিউজ১ অডিও ভয়েস: এই খবরটি শুনুন
বাঁকুড়ায় আত্মসমর্পণ করলেন তিন মাওবাদী শীর্ষ নেতা নেত্রী! — ছবি: নিউজ১।