আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই পালিত হতে চলেছে বাংলা তথা সারা দেশের শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব শারদীয় দুর্গাপুজো। আশ্বিণী শুক্লা পক্ষে দেবী দুর্গতিনাশিনীর অকালবোধনের আগে শ্রী শ্রী দুর্গা মাতার অপর এক রূপ দেবী ভগবতীর পুজোয় থাকে প্রাক শারদীয়ার উৎসবী ছোঁয়া। পশ্চিম বর্ধমানের খনি শিল্পাঞ্চল জুড়ে বেশ কিছু জায়গায় দেবী ভগবতীর পুজো সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। অন্ডাল ব্লকের উখরা ঘোষ পাড়ার ভগবতী পুজো এই অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন বলে ইতিহাস বিদদের দাবি। আশ্বিণী দুর্গার মতনই দেবী ভগবতীরও চার দিন ধরেই পুজো আর্চা সম্পন্ন হয়।তবো দেবী এখানে অসুর নাশিনী রূপে আসেন না। কথিত আছে আশ্বিন মাসে দেবীর অকাল বোধনের মাসখানেক আগেই দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে তাঁর দুই সহচরী জয়া ও বিজয়াকে মর্ত্য পরিভ্রমণে পাঠান।তাঁরা কৈলাশে ফিরে গিয়ে দেবীকে মর্ত্যের আগাম সংবাদ প্রদান করেন। তাই দেবী এখানে অসুরনাশিনীর বদলে জয়া, বিজয়া ও এবং লক্ষ্মী ও সরস্বতী এই দুই কন্যার সঙ্গে আসেন। প্রাচীন মত অনুসারে দেবী ভগবতীর পুজোর প্রথম সূচনা করেছিলেন রাজা সুর। মার্কেণ্ডেয় পুরান ও শ্রী শ্রী চন্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী, সত্য যুগের শেষে চেদিরাজ বংশের রাজা সুরথ তাঁর রাজ্য হারিয়ে এবং সমাধী বৈশ্ব তাঁর পরিবারের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে মেধস মুনির আশ্রমে আশ্রয় নেন। মুনির পরামর্শে রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্য উভয়ে মিলে নদীর তীরে একটি মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মাণ করে মহাশক্তি দেবী মহামায়ার পুজো শুরু করেন। রাজা সুরত প্রতিষ্ঠিত এই দেবীই হলেন ভগবতী। বসন্তকালে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে এই পুজোকে বলা হয় বাসন্তী পুজো। তবে ভিন্নমত অনুযায়ী কোথাও কোথাও শরৎ কালেও দেবীকে ভগবতী রূপে পুজো করার চল রয়েছে। দেবী দুর্গার মতনই সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী এই চার দিন ধরেই চলে পূজার্চনা। ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধারের জন্য যখন মহা সংগ্রামে ব্যাপৃত, তখন মহাপরাক্রমশালী রাজা রাবণকে বধ করার উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে দেবীর অকালবোধন করে তাঁর পূজার্চণা করেছিলেন। সেই সময় থেকেই শরৎকালে অনুষ্ঠিত দেবী অসুরনাশিনী দুর্গা পুজোর প্রচলন শুরু হয়। এ কারণেই তাঁকে মহিষাসুরমর্দিনীও বলেও আখ্যায়িত করা হয়। এ বাংলায় বাসন্তী বা ভগবতী পুজো সেই অর্থে জনপ্রিয়তা লাভ না করলেও পরবর্তীকালে দুর্গার আরও এক রূপ জগদ্ধাত্রী পুজো অত্যন্ত জাঁকজমক ও সাড়ম্বরের সঙ্গে পালন করা হয় সারা বাংলা জুড়েই। উখরার ঘোষপাড়ার এই দেবী ভগবতীর পুজোকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই গোটা খনি অঞ্চল জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের মহা সৌরভ। আনন্দে উদ্বেলিত খনি এলাকার প্রতিটি মানুষ। বর্তমানে ঘোষপাড়ার প্রায় ৬৫টি পরিবার যৌথভাবে তাঁদের প্রাণের উৎসবে সামর্থ্য মত অর্থ দান করে থাকেন। দুর্গা পুজোর মতোই দেবী ভগবতীর পুজোতেও সপ্তমীতে নবপত্রিকার স্নানযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। পুজো উপলক্ষে প্রতিদিনই থাকে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই পল্লী এলাকার প্রতিটি মানুষ চারদিন ধরে একসাথে খাওয়া দাওয়া ও অন্যান্য যাবতীয় আনন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকেন। অখিলেশ ঘোষ নামে এই পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা জানান, আনুমানিক দেড়শ বছরের পুরনো তাঁদের এই পুজো। একসময় ছোট্ট একটি মাটির মন্দিরেই দেবীর আরাধনা করা হত। তখন দেবীর কোন মূর্তিও গড়া হতনা।পরবর্তীকালে সকলের সহযোগিতায় এখানে নির্মিত হয় একটি সুদৃশ্য মন্দির। এবং প্রতি বছরই দেবীর অপরূপ প্রতিমা গড়ে চলে ভক্তি ভরে পুজো অর্চনা। সেই অর্থে বিশ্বকর্মা পুজো এবং রাধাষ্টমীর যুগ্ম উৎসবী আবহের মধ্যেই ভগবতী পুজোর এই আয়োজনের মধ্য দিয়েই শারদীয়া দুর্গোৎসবের শুভ সূচনা যেন হয়ে যায় সমগ্র খনি এলাকায়।
ভাদু গানের সুরের মূর্ছনায় মাতল অন্ডালের খনি এলাকা!
ভাদু গানের সুরের মূর্ছনায় মাতল অন্ডালের খনি এলাকা!
নিউজ১ অডিও ভয়েস: এই খবরটি শুনুন
ভাদু গানের সুরের মূর্ছনায় মাতল অন্ডালের খনি এলাকা! — ছবি: নিউজ১।