সাধক কবি নীলকন্ঠ মুখোপাধ্যায়ের পবিত্র জন্মস্থান ধবনী গ্রাম থেকে পায়ে চলা রাস্তায় মাত্র মাইল দেড়েকের পথ। কুনুর ও টুমনি নদীর সীমানা ঘেঁষে যে প্রাচীন জনপদটি একসময় তৈরি হয়েছিল তার নাম কাঁটাবেড়িয়া।এই কাঁটাবেড়িয়া গ্রামেরই এক অলৌকিক ঘটনাকে ঘিরে এ গ্রামে পত্তন হয়েছিল দেবী মহামায়ার মহাপুজো।শোনা যায় গ্রামের পাশে থাকা একটি বৃহদাকার বল্মীক বা উইঢিবি থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গিয়েছিল দৈবিক আতপ চাল! সেই অলৌকিক আতপ চাল দিয়েই শুরু হয়েছিল শ্রী শ্রী রাধামাধবের আরাধনা। আর সেই ঘটনাকে ঘিরেই জড়িয়ে রয়েছে প্রায় দেড়শো বছরের দুর্গাপুজোর ইতিহাসও। শুধু তাই নয়, মন্দিরের ভিতরেই আজও রয়েছে একটি রহস্যময় গুহা। কথিত আছে, এই গুহাভ্যন্তরে বসেই একসময় সাধনা করেছেন বহু সিদ্ধপুরুষ। এমনকী ওই গুহার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গপথের রহস্যময় কাহিনিও। যে পথ ধরে নাকি একসময় বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যেত!একদিকে ইতিহাসের হাতছানি, অন্যদিকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়া লোকবিশ্বাস আর অলৌকিক কাহিনীর আশ্চর্য মেলবন্ধনেই সৃষ্টি হয়েছিল দুর্গাপুর- ফরিদপুরের কাঁটাবেড়িয়ার প্রাচীন এই দেব মন্দির। সময় বদলেছে, বদলেছে চারপাশের ছবিও। একই সঙ্গে বদলে গিয়েছে সামাজিক চালচিত্রও। এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃন্দাবনের দামোদর চন্দ্র ব্রজবাসীর নাম। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি বীরভূম জেলা থেকে পশ্চিম বর্ধমানের উখড়ার মোহন্ত আশ্রমে যাতায়াত করতেন। হাতির পিঠে চেপে দীর্ঘ প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতেন তিনি। সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে কাঁটাবেড়িয়া এলাকায় কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতেন দামোদর চন্দ্র।কথিত আছে একদিন বিশ্রাম নিতে এসে তাঁর নজরে পড়ে এক আশ্চর্য দৃশ্য। একটি উইঢিবি থেকে বেরিয়ে আসছে আতপ চাল! সেই দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন তিনি। এরপর সেই চাল দিয়েই শুরু করেন রাধামাধবের পুজো।সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে এই স্থানের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে।সাধক কবি নীলকন্ঠ মুখোপাধ্যায়ের ভক্তিমূলক পদাবলীতেও এই ঘটনার উল্লেখ পাই আমরা। পরবর্তীকালে রাধামাধবের মন্দিরের পাশেই প্রতিষ্ঠা করা হয় দেবী দুর্গাকে। আর সেই থেকেই কাঁটাবেড়িয়া এলাকায় শুরু হয় দুর্গাপুজোর এক নতুন অধ্যায়। তবে এই মন্দিরের আকর্ষণ শুধুই উইঢিবি থেকে আতপ চাল বেরিয়ে আসার কাহিনিতেই সীমাবদ্ধ নয়। মন্দিরের ভিতরে থাকা গুহাকে ঘিরেও রয়েছে নানান রহস্য। স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে, একসময় বহু সিদ্ধপুরুষ ওই গুহায় বসে সাধনা করতেন। গভীর সাধনার জন্য নির্জন এই স্থান বেছে নিতেন তাঁরা,এমনটাই বিশ্বাস প্রবীণদের একাংশের। শুধু তাই নয়, ওই গুহার সঙ্গে সুড়ঙ্গপথের কথাও প্রচলিত রয়েছে। সেই সুড়ঙ্গ দিয়েও নাকি একসময় বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যেত। প্রায় দেড়শো বছর ধরে চলে আসা এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এলাকার মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। প্রবীণদের দাবি, একসময় এই তল্লাটে দুর্গাপুজোর প্রচলন খুব একটা ছিল না। সেই সময় কাঁটাবেড়িয়ার এই মন্দিরের পুজোই হয়ে উঠেছিল আশপাশের এলাকার মানুষের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। মহাপুজোর দিনগুলিতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হত। দেবীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে মন্দির চত্বর পরিণত হত মিলনমেলায়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন পুজো দেখতে, অঞ্জলি দিতে এবং প্রসাদ গ্রহণ করতে। প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় আগের বছরের প্রতিমার কাঠামো বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর নতুন প্রতিমা তৈরি করে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বছরের পর বছর ধরে এই নিয়ম মেনেই চলে আসছে দেবীর পুজো।প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, একসময় এই মন্দিরে এসেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মন্দির ঘুরে দেখেছিলেন বলেও দাবি স্থানীয়দের একাংশের। যদিও এই ঘটনার কোন প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। দুর্গা মন্দিরের সেবায়েত জীবনকৃষ্ণ রায় বলেন,বহু পুণ্যাত্মা সাধকের স্মৃতিবিজড়িত এই মন্দির। এই তল্লাটে তখন সেভাবে দুর্গাপুজো হত না। এখানেই শুরু হয়েছিল এই এলাকার দুর্গাপুজো। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হত। সকলের জন্য খিচুড়ি প্রসাদের ব্যবস্থা করা হত। সেই নিয়ম মেনে এখনও খিচুড়ি প্রসাদ খাওয়ানো হয়। দেবীর আরাধনা চলে, পুজোর কয়েকটি দিন ধরেই অনুষ্ঠিত হয় নানান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।আর এভাবেই ভক্তি ও বিশ্বাসের বুনিয়াদে আজও গ্রামীন এলাকার শারদ মুহূর্তগুলি অতিবাহিত হয় এক বর্ণিল স্বপ্ন ঘোরের মধ্যে দিয়ে।
গৌরবাজারের দুর্গোৎসবে ঝরে পড়ে নহবতের সুর! || দুর্গাপুর ||
গৌরবাজারের দুর্গোৎসবে ঝরে পড়ে নহবতের সুর! || দুর্গাপুর ||
নিউজ১ অডিও ভয়েস: এই খবরটি শুনুন
গৌরবাজারের দুর্গোৎসবে ঝরে পড়ে নহবতের সুর! || দুর্গাপুর || — ছবি: নিউজ১।