কবি থেকে শিল্পী সকলেরই কল্পলোকে বিচরণ করে ভারতের জাতীয় ফুল পদ্ম। পদ্ম, কমল, সরোজ, নীরজ, রাজীব, তামরস, শতদল, কুবলয় কিংবা সরোরুহ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, দুর্গাপুজো এলেই সর্বপ্রথম মনে পড়ে এই প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি এবং নান্দনিক শোভাময় এই পার্থিব পারিজাতের কথা। কারণ দুর্গাপুজো মানেই সেখানে প্রয়োজন পদ্মফুল। গড়পরতা হিসেবে ভারতে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লক্ষেরও বেশি দুর্গাপুজো হয়ে থাকে। সারা ভারতের পদ্ম ফুলের সিংহভাগই যোগান দেয় বাংলা, বিহার ও উত্তর প্রদেশ। পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলির মধ্যে পদ্ম চাষে অগ্রগণ্য ভুমিকা রয়েছে বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান ও হুগলি জেলার। হুগলি জেলার পান্ডুয়া ব্লকের খন্যান সংলগ্ন তাম্বা গ্রামে প্রতিবছরই লক্ষ লক্ষ টাকার পদ্ম ফুলের কেনাবেচা হয়। কোন কোন বছর প্রায় কোটি টাকার উপরও ব্যবসা করেন পদ্ম চাষীরা। পদ্ম চাষীদের একটি স্থূল হিসেবে দেখা গিয়েছে শুধু তাম্বা গ্রামেরই প্রায় আড়াই হাজার বিঘা জমিতে পদ্মের চাষ করেন পদ্ম চাষীরা। তবে শুধু পান্ডুয়ার তাম্বা গ্রামেই নয়, পোলবা এবং বলাগড় থেকেও স্থানীয় বাজারে লক্ষ লক্ষ টাকার পদ্ম ফুলের কেনা বেচা করেন পদ্ম ব্যবসায়ীরা। সারা বছরই কঠোর পরিশ্রম করে তবেই কিছুটা লাভের মুখ দেখেন দরিদ্র কৃষক কূল। এই এলাকার উৎপাদিত পদ্মফুল মূলত কলকাতার মল্লিক ঘাট ফুলের বাজারে বিক্রি হয় পুজোর মরশুমে।এ ছাড়াও বিভিন্ন হিমঘর গুলিতেও পদ্মফুল রাখেন চাষীরা।এদিকে ফুলের ফলন ভালো হলেও সমস্যা, আবার ফলন কম হলেও চরম সমস্যায় পড়েন পদ্ম চাষীরা। এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় খুব একটা লাভের মুখ দেখবেন না বলেই মনে করছেন তাঁরা। তবে দুর্গাপুজো যেহেতু এখনো প্রায় কুড়ি-পঁচিশ দিন দেরি আছে, তাই সে ক্ষেত্রে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ফুলের দাম কিছুটা বাড়লেও বাড়তে পারে বলেই আশায় বুক বেঁধেছেন তাঁরা।প্রায় বারো বিঘা জমিতে পদ্মের চাষ করেছেন তাম্বার পদ্ম চাষী রাজেশ্বর বিশ্বাস। তিনি বলেন, আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে যে সংখ্যক পদ্মফুল পাওয়ার কথা ছিল তা হয়তো পাওয়া যাবে না। ফলে এ বছর লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, চাষের খরচ উঠবে কিনা তা নিয়েই শঙ্কিত তাঁরা। অন্যদিকে প্রায় ছয় বিঘা জমিতে পদ্ম চাষ করেছেন গুরুপদ মাঝি নামে এক কৃষক। তাঁরও দাবি এ বছর পদ্মের সেরকম দাম নেই। তবে বাংলার বিভিন্ন বাজারে দাম না পেলেও এখান থেকেই ইংল্যান্ড, আমেরিকা এমনকি ভারতের হায়দ্রাবাদ, মুম্বাই, চেন্নাই সহ বিভিন্ন শহরে তাঁদের উৎপাদিত পদ্মফুল রপ্তানি হয়। ফলে তখন কিছুটা লাভের মুখ দেখা যায়। পদ্ম চাষী মন্টু দেবনাথের আক্ষেপ, এ বছর গণেশ চতুর্থীতেও সেভাবে পদ্মের বাজার জমে ওঠেনি। প্রতি পিস পদ্মফুল দেড় থেকে দুই টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে তাঁদের। তিনিও দিল্লি, হায়দ্রাবাদ, মুম্বাই সহ বিভিন্ন শহরে তাঁর উৎপাদিত পদ্মফুল রপ্তানি করে থাকেন। পদ্ম চাষীদের আক্ষেপ, সারা বছর ধান, আলু ইত্যাদি চাষ করেও সেভাবে লাভের মুখ দেখা যায় না। তাই বাধ্য হয়েই একসময় বিকল্প হিসেবে পদ্মফুলকেই তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও রয়েছে বিস্তর প্রতিযোগিতা ও সরকারি ঔদাসীন্যের কাঁটা।বিগত কয়েক বছরের মত এ বছরও জেলা জুড়ে পদ্মের আকাল।এদিকে কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে মহাপুজোর। আর দেবী মহামায়ার মহাপুজোয় পদ্মফুল চাইই চাই। ন্যূনতম ১০৮- টি পদ্মফুল দেবীর পুজোয় লাগবেই। এদিকে সারা হুগলি জেলা জুড়ে এবছর বৃষ্টির দেখা নেই। ফলে পদ্মচাষীদের মাথায় হাত।দুর্গাপুজোর কয়েক মাস আগেই জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলির পুকুরে পদ্মফুলের চাষ করেন পদ্মচাষীরা। এদিকে দুর্গাপুজো এগিয়ে আসছে। তাই পদ্মচাষীদের ভরসা এখন হিমঘর গুলিতে রাখা পদ্মফুলই।এই মরশুমে সেই উদ্যোগ অনেকটাই ধাক্কা খাবে বলে মনে করছেন পদ্মচাষীরা। স্থানীয় এক পদ্মচাষী বলেন, প্রতিবছরই দক্ষিণ বঙ্গের জেলাগুলি থেকে
পদ্মফুল সংগ্রহ করে হিমঘরগুলিতে রেখে দেওয়া হয়।হুগলি,বাঁকুড়া বীরভূম, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান,মুর্শিদাবাদ,নদীয়া প্রভৃতি জেলা ছাড়াও ঝাড়খন্ডের বিভিন্ন জেলা থেকে পদ্মফুল সংগ্রহ করেন পদ্ম চাষীরা।এবার জেলার হিমঘরগুলিতে প্রায় পাঁচ লক্ষের মত পদ্মফুল রাখা হয়েছে। দুর্গাপুজো শুরুর দু' একদিন আগে সেই ফুল হিমঘর থেকে বের করে বিভিন্ন ফুলের বাজারে পাঠানো হবে বলে জানান ওই পদ্মচাষী। তবে হিমঘরে রাখা পদ্মফুলগুলি বেশীরভাগই শুকিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে সেই ফুলই কিনতে হয় পুজো কমিটি গুলিকে। অন্যান্য বছর পদ্মের দাম থাকে প্রতি পিস ১০ থেকে ১৫ টাকা। এবার সেই পদ্মেরই দাম কম করেও প্রতি পিস ২০ থেকে ২৫ টাকা রাখতেই হবে।
এ বিষয়ে জেলারই এক ফুল ব্যবসায়ী বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে পদ্মফুল সংগ্রহ করার জন্য প্রথমত পরিবহন খরচ অনেকটাই বেড়েছে। এর উপর আছে হিমঘরের খরচ। তাই সব মিলিয়ে কিছুটা লাভের মুখ দেখতে হলে ওই দামের নীচে কোনভাবেই বিক্রি করা সম্ভব হবেনা বলে দাবি ওই ফুল ব্যবসায়ীর। এদিকে শুধু দুর্গাপুজোই নয়, এর পাশাপাশি লক্ষ্ণীপুজো ও কালী পুজোতেও প্রয়োজন হয় পদ্মফুলের। পদ্মের ফলন ভালো হলে হয়তো দেবী মহামায়ার মহাপুজোর অত্যাবশকীয় এই জাতীয় ফুল নিয়ে এতখানি দুশ্চিন্তায় পড়তে হত না চাষীদের। এ বিষয়ে পান্ডুয়ার বিধায়ক তুষার মজুমদার বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পদ্ম চাষ অনেকটাই বেড়েছে। পদ্ম মূলত পুকুরেই চাষ হত, এখন জমিতেও চাষ হচ্ছে। বিভিন্ন পরিবহন সংস্থা গুলির মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে পদ্মফুল। তবে আগামী দিনে যাতে পদ্মফুল সংরক্ষণের জন্য উন্নত মানের হিমঘরের ব্যবস্থা করা যায়, সে ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও আলোচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন বিধায়ক...
পদ্মচাষে ভাটা, দুশ্চিন্তার মোটা ভাঁজ চাষীদের কপালে!!
পদ্মচাষে ভাটা, দুশ্চিন্তার মোটা ভাঁজ চাষীদের কপালে!!
নিউজ১ অডিও ভয়েস: এই খবরটি শুনুন
পদ্মচাষে ভাটা, দুশ্চিন্তার মোটা ভাঁজ চাষীদের কপালে!! — ছবি: নিউজ১।