“শিক্ষা বিদ্যা বুদ্ধি জ্ঞান উন্নতি, যা কিছু, সব সুখের জন্য।” — শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস উপন্যাসের এই কথার মধ্যে শিক্ষার যে বৃহত্তর তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে, তার জীবন্ত উদাহরণ যেন দুর্গাপুরের সগড়ভাঙার রবীন্দ্রনাথ চন্দ্র। তাঁর কাছে শিক্ষা কেবল পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার সোপান নয়, বরং পিছিয়ে পড়া জীবনের অন্ধকার সরিয়ে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়ার হাতিয়ার। তাই গলায় ক্যানসার বাসা বাঁধলেও থামেনি তাঁর পাঠশালা। ক্ষীণ কণ্ঠে আজও তিনি প্রতিদিন পড়াচ্ছেন শতাধিক পড়ুয়াকে।তাঁর সারস্বত বোধের মধ্যেই অন্তর্নিহিত ছিল গভীর জীবন দর্শনের স্বর্গীয় দীপ্তি।তাই শিক্ষাকেই বাহন করে তিনি এই অসুস্থ শরীরেও জ্ঞান সমুদ্রে বেয়ে চলেছেন মানুষ গড়ার শাশ্বত তরণি। এ গল্পের
শুরু হয়েছিল প্রায় দু’দশক আগে। দুর্গাপুরের সগড়ভাঙার কয়েকটি আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুকে নিয়ে নিজের বাড়িতেই বিনামূল্যের পাঠশালা খুলেছিলেন জ্ঞান তাপস রবীন্দ্রনাথবাবু। তখন ছিল না কোনও বড় ঘর, ছিল না পরিকাঠামো। ছিল পুরনো একটি স্কুটার আর শিশুদের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার দুর্নিবার ইচ্ছা।
সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে সেই স্কুটারে চেপেই প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরতেন তিনি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়তে নিয়ে আসতেন। পড়া শেষে অনেক সময় নিজের দায়িত্বেই তাদের বাড়ি পৌঁছে দিতেন। কারও মুখে খাবারের অভাব দেখলে সামর্থ্য অনুযায়ী তার ব্যবস্থাও করতেন। ধীরে ধীরে সেই ছোট্ট উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। বাড়িতে জায়গা না হওয়ায় একটি পরিত্যক্ত গোয়ালঘর পরিষ্কার করে সেখানে শুরু হয় নতুন পর্ব।এরপরও পথ মসৃণ ছিল না। স্থান পরিবর্তন থেকে প্রশাসনিক টানাপোড়েন—বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু নিজের সংকল্প থেকে সরেননি রবীন্দ্রনাথবাবু। স্থানীয় বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় আজ সেই উদ্যোগের পরিধি অনেকটাই বিস্তৃত। বর্তমানে প্রায় ১২০ জন ছাত্রছাত্রী সেখানে নিয়মিত পড়াশোনা করে।
তবে এই পাঠশালায় শিক্ষার পরিধি পাঠ্যবইয়ের পাতায় আটকে নেই। আঁকা, আবৃত্তি, সেলাই, কম্পিউটার, যোগাসন, বুটিকের কাজ-সহ নানা সৃজনশীল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এমনকী এলাকার প্রবীণ মানুষদেরও সপ্তাহে একদিন লেখাপড়া শেখানো হয়। তাঁদের ব্যক্তিগত অভাব-অভিযোগের কথাও শোনেন শিক্ষক। একসময় যাঁরা তাঁর কাছে পড়েছেন, তাঁদের অনেকেই এখন স্বেচ্ছায় ফিরে এসে নতুন পড়ুয়াদের শেখান।
এই আলোকবর্তিকার পথেই ২০১৯ সালে আচমকা নেমে আসে অন্ধকার। রবীন্দ্রনাথবাবুর গলায় ধরা পড়ে ক্যানসার। একাধিক অস্ত্রোপচারের পরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বরযন্ত্র। কথা বলার স্বাভাবিক ক্ষমতাও অনেকটাই হারান তিনি। কিন্তু রোগ তাঁকে ক্লাসরুম থেকে সরাতে পারেনি। ক্ষীণ স্বরে আজও পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমি এসবকে ভয় করি না। অদম্য মানসিক শক্তিই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মা সারদামণিই আমার শক্তি, উনিই পথ দেখান।”
প্রাক্তন ছাত্রের মা দীপা দাস বলেন, “আমার ছেলে এখন কলেজে ডিপ্লোমা করছে। আগে এখানে বাংলা পড়তে আসত। এখন সময় পেলেই নিজে পড়াতে চলে আসে।” তাঁর কথায় স্পষ্ট, রবীন্দ্রনাথবাবুর সাফল্য শুধু কতজন পড়ুয়া তাঁর কাছে এসেছে, তাতে নয়; বরং কতজনকে তিনি অন্যের জন্য কিছু করার মানসিকতা তৈরি করে দিতে পেরেছেন, সেখানেই।দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানিয়েছেন, এই মহৎ উদ্যোগে তিনি আগেও পাশে ছিলেন, আগামী দিনেও সহযোগিতা করবেন। একসময় যে মানুষটি পুরনো স্কুটারে চেপে দুঃস্থ শিশুদের খুঁজে বেড়াতেন, আজ তাঁর অপেক্ষায় থাকে প্রায় ১২০টি মুখ। কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়েছে, শরীর ক্লান্ত; কিন্তু শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। সগড়ভাঙার সেই পাঠশালায় তাই প্রতিদিন ক্যানসারের বিরুদ্ধে শুধু একজন মানুষের লড়াই নয়, অন্ধকারের বিরুদ্ধে শিক্ষারও এক নিরন্তর সংগ্রাম দৃশ্যমান।
মারণব্যাধির সঙ্গে লড়াই! তবু অদম্য জেদে আজও মানুষ গড়ার কাজে অক্লান্ত রবীন্দ্রনাথ!
মারণব্যাধির সঙ্গে লড়াই! তবু অদম্য জেদে আজও মানুষ গড়ার কাজে অক্লান্ত রবীন্দ্রনাথ!
নিউজ১ অডিও ভয়েস: এই খবরটি শুনুন
মারণব্যাধির সঙ্গে লড়াই! তবু অদম্য জেদে আজও মানুষ গড়ার কাজে অক্লান্ত রবীন্দ্রনাথ! — ছবি: নিউজ১।