দেওয়াল লিখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে রাজ্যের শাসকদলের কাছে! ইতিমধ্যেই রাজ্যের বুকে রাখা থার্মোমিটারের পারদ যে তরতর করে বেড়ে চলেছে সেটাও টের পাচ্ছেন শাসকদলের সব ওজনেরই নেতা-নেত্রীরা! তাই হয়তো দুর্গাপুর নগর নিগমের সীমানা পুনর্বিন্যাস করে আস্তিনে কয়েকটা বাড়তি তুরুপের তাস রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই দুর্গাপুর নগর নিগমের ৪৩ টি ওয়ার্ড কে ভেঙেচুরে ৫৩ টি ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। কাল্পনিক সেই ভৌগোলিক রেখায় এখন থেকেই প্রয়োজন মতো রঙের তাস ব্যবহার করতে শুরু করেছেন তাঁরা। সীমানা পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন হলেও সাবেক নগর নিগমের জমির সঙ্গে এক ছটাক নতুন জমিও আর যুক্ত করা হয়নি। তবে ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৩ থেকে ৫৩-টি হতে চলেছে।বিরোধী শিবিরের দাবি, মোট দশটি ওয়ার্ডের উপর ছুরি চালিয়ে সেগুলিকে শাসকদলের নিজেদের সুবিধামতো সাইজ করে নেওয়া হয়েছে। জানা গিয়েছে, দুর্গাপুর নগর নিগমের ১, ৪,১৪, ২২, ২৬,২৭, ২৮, ৩০, ৩৫ ও ৪৩ এই দশটি ওয়ার্ডকে ভেঙ্গে দু' টুকরো করা হচ্ছে। ফলে ১০-টি ওয়ার্ডের ক্রমিক সংখ্যাও পুরোপুরি ভাবে বদলে যাবে। যেটি সাবেক ২-নম্বর ওয়ার্ড ছিল সেটি আর এখন ২-নম্বর ওয়ার্ড থাকছে না। এক নম্বর থেকে টুকরো করে ভেঙে আসা খানিকটা অংশ নিয়েই তৈরি হচ্ছে নতুন ২-নম্বর ওয়ার্ড। একইভাবে ৪- নম্বর ওয়ার্ড ভেঙে ৫ ও ৬-নম্বর ওয়ার্ডের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সাবেক ৫ ও ৬- নম্বর ওয়ার্ডের ক্রমিক সংখ্যাও বদলে যাবে ঠিক একই নিয়মে। প্রত্যেকটির ক্রমিক সংখ্যা বদলে গিয়ে মোট ৫৩-টি ওয়ার্ড তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে পুরো প্রক্রিয়াটি প্রস্তাবের আকারে থাকলেও খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে সরকারি গেজেট নোটিফিকেশন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে দুর্গাপুর পূর্ব ও দুর্গাপুর পশ্চিম, দু'টি বিধানসভা এলাকাতেই তার কমবেশি প্রভাব পড়বে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি। একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ৪৩-টি ওয়ার্ডের মধ্যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত যে ওয়ার্ড গুলিতে তৃণমূল ও বামেদের শক্তি তুলনায় অনেকটাই বেশি ছিল, বেছে বেছে সেই গুলির উপরেই ছুরিকাঘাত করা হচ্ছে বলে বিরোধী দল গুলির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। এ বিষয়ে তৃণমূলের পক্ষ থেকে উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়ের দাবি, 'সীমানা বিন্যাসের পূর্ণাঙ্গ ছবি তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়। তাই কোথায় জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটেছে,কোথায় জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে এই বিষয়গুলি সম্পূর্ণভাবে না জেনে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না'। তবে এই সীমানা বিন্যাসের বিষয়ে জেলা কংগ্রেস সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তী বলেন, 'যে এলাকাগুলিতে বিরোধীদের ভোট বেশি, বেছে বেছে সেই ওয়ার্ডগুলিকেই দু'টুকরো করা হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত যেহেতু অফিশিয়ালি কোন নোটিফিকেশন হয়নি, তাই এ নিয়ে এখনই কোন মন্তব্য করতে চাইনা'। বিষয়টি নিয়ে সিপিএম নেতা সিদ্ধার্থ বসু বলেন, 'বিজেপি তাদের মর্জি মাফিক এইভাবে ওয়ার্ড গুলির উপর ছুরি চালাবে, তা আমরা কখনোই মেনে নেব না। কারণ এই ওয়ার্ড ভাঙ্গার ব্যাপারে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়নি। প্রশাসন এবং রাজ্যের শাসক দল মিলে একক ভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না'। যদিও বিরোধীদের তোলা সমস্ত অভিযোগকেই কার্যত পুরোপুরিভাবেই উড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপির মুখপাত্র সুমন্ত মন্ডল। তিনি বলেন, 'বিধানসভা নির্বাচনে দুর্গাপুরের ৪৩ টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র একটি ওয়ার্ডে বিরোধীরা অর্থাৎ তৃণমূল এগিয়েছিল। বাকি ৪২- টি ওয়ার্ডেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিজেপি। যে ওয়ার্ড গুলিতে বুথ সংখ্যা ১০ বা ১২-র অধিক, শুধু সেই ওয়ার্ডগুলিকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ ছোট ছোট ওয়ার্ড হলে সার্বিকভাবে পুর পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হয়। সে কথা বিবেচনা করেই এই ডিলিমিটেশনের সিদ্ধান্ত বলে প্রাথমিকভাবে তাঁর ধারণা। ডিলিমিটেশন হওয়ার পর নির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যের শাসকদলকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেতে হলে ন্যূনতম ২৭-টি ওয়ার্ডে জয় পেতে হবে। রাজ্যে সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে দুর্গাপুরের দু'টি আসনেই বড় মার্জিনে জয় পেলেও শাসকদলের সাংগঠনিক ভিত যে খুব মজবুত, তা কখনোই বলা যায় না। নির্বাচনে পরাজিত হলেও এখনও বুথ স্তরে তৃণমূলের সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রশ্নাতীত।মাত্র কয়েক মাসে তৃণমূলের সেই শূন্যস্থান কখনোই গেরুয়া শিবির পূরণ করতে পারেনি। তাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দুর্গাপুর নগর নিগমের দখল শেষ অব্দি কাদের হাতে থাকবে,তা নিয়ে সংশয় থাকছেই! রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের প্রকার ভেদে নির্বাচকদের মর্জি এবং পছন্দেরও হেরফের ঘটে থাকে। লোকসভা, বিধানসভা এবং পুর নিগমের নির্বাচন চরিত্রগত দিক থেকে নিশ্চিত ভাবেই এক নয়। তাই বিধানসভা তে নিরঙ্কুশ জয় পেলেও তাতে শাসকদলের কপালে চিন্তার ভাঁজ পুরোপুরি ভাবে শূন্য হবে একথাও কখনোই জোর দিয়ে বলা যায় না।তাই হয়তো সেই বাস্তব পাটিগণিতকে সামনে রেখেই শাসক দল তড়িঘড়ি দুর্গাপুর নগর নিগমের সীমানা বিন্যাস ঘটিয়ে ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও অনেকেই মনে করছেন। পাশাপাশি আরও একটি বিষয় গেরুয়া শিবিরকে অত্যন্ত চাপে রেখেছে তা হল, রাজ্যে ক্ষমতার হাত বদল হতেই যেভাবে শাসকদলের জার্সি পরে একদল তোলাবাজ সরাসরি তোলাবাজির দোকান খুলে বসেছে, তাতে জনমানসে শাসক দলের ছবিটা খুব কম সময়ের মধ্যেই অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গিয়েছে।ফলে এখন থেকেই প্রমাদ গুনতে শুরু করেছে শাসক শিবির! নির্বাচনে এ সমস্ত কিছুই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেই শাসকদলের গণিতজ্ঞরা ইতিমধ্যেই হিসাব কষে ফেলেছেন। আর সেই বাস্তবতা থেকেই বিজেপি শিবিরকে এখন নানান রাসায়নিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। কারণ কখন লাল লিটমাস নীল হয়ে যাবে রাজনীতির রসায়নাগারে, তার কোন আগাম আন্দাজ কেউই করতে পারেন না। তাই প্রশ্ন উঠছে, অনেক অংক কষেই কি দুর্গাপুর নগর নিগমের ওয়ার্ড সংখ্যা এক লাফে দশটি বেড়ে গেল??
দুর্গাপুরে ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি! অঙ্ক নাকি আতঙ্ক!!
দুর্গাপুরে ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি! অঙ্ক নাকি আতঙ্ক!!
নিউজ১ অডিও ভয়েস: এই খবরটি শুনুন
দুর্গাপুরে ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি! অঙ্ক নাকি আতঙ্ক!! — ছবি: নিউজ১।